১৯৯৯ সালে দাতা সংস্থা ডানিডার স্বল্প আর্থিক সহায়তায় সজাগ-এর কৃষি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। সংগঠিত কৃষক সদস্যদের ব্যাপক চাহিদা এবং কর্মসূচির আশানুরূপ সফলতার কারণে ‘সজাগ’ দীর্ঘ ছয় বছর নিজস্ব সম্পদের মাধ্যমে কৃষিঋণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। সজাগ-এর কৃষি ঋণ আদান-প্রদানের ধারাবাহিক সফলতা দেখে পিকেএসএফ ২০০৫ সাল থেকে কৃষিখাতে ঋণ প্রদানে এগিয়ে আসে। কৃষিখাতে বিশেষ অবদানের জন্য ‘সজাগ’ ২০০৭ সালে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মাননা লাভ করেছে। বর্তমানে এ কার্যক্রম সুফলন (কৃষি) নামে পরিচিত।

কৃষিখাতে ক্ষুদ্র ঋণ : কৃষিখাতে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম সজাগ-এর অন্যতম সফল কর্মসূচি। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকদেরকে মানবমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করাই সজাগ-এর অন্যতম লক্ষ্য। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সমগ্র ধামরাই উপজেলাসহ সাভার, কালিয়াকৈর, মির্জাপুর, সাটুরিয়া, সিংগাইর এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ৪৪টি ইউনিয়নের ৩৪৮টি গ্রামে ১৩৮৩টি সমিতির ১৭,৫৫২জন সংগঠিত সদস্যদের সাথে কাজ করছে। ‘আয় থেকে দায় সারা’ দর্শনের উপর ভিত্তি করে কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে বোরো ও আমন ধানসহ সবজি উৎপাদনের জন্য স্বল্প সেবা মূল্যের বিনিময়ে ১১,১৮৮ জন সদস্যদের মাঝে মোট ৩৩ কোটি ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা পুঁজি সরবরাহ করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আমন ও বোরো মৌসুমে ধান চাষের উপর কৃষক সদস্যদের মাঝে বিতরণকৃত  পুঁজির প্রায় শতভাগ  (৯৮.৫%)  ভাগ আদায় হয়েছে। এ বছর সজাগ-এর ১২০ জন কর্মকর্তা ও কর্মী কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছে। সজাগ-এর কৃষি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কর্মসূচি শুরুর প্রথমদিকে কর্মসূচিভিত্তিক কোনো কর্মী ছিল না। সজাগ-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী দিয়েই কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়ন করা হত। বর্তমানে কৃষিখাতে শুধু পূর্ণকালীন কর্মীর সংখ্যাই ৫২ জন। কর্মীদের মধ্যে ৪ জন কৃষিবিদ এবং ২২ জন ডিপ্লোমা কৃষিবিদও রয়েছেন।

বীজ উৎপাদন কর্মসূচি: “সু-বংশে সুসন্তান সুধীজনে কয়, সু-বীজে সুফসল জানিবে নিশ্চয়”।

সংগঠিত কৃষক সদস্যদের মানসম্মত উচ্চ ফলনশীল বীজ সরবরাহের লক্ষ্যে ‘সজাগ’ বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান  ও কৃষি গবেষণা কেন্দ্র  থেকে প্রাপ্ত ধান, সরিষা, ভূট্টা, আলু, কলা ইত্যাদির বীজ ও চারা সংগ্রহ করে নিজস্ব খামারে এবং চুক্তিবদ্ধ চাষীর মাধ্যমে উৎপাদিত বীজ বা চারা সরবরাহ করা হচ্ছে আগ্রহী কৃষকদের মধ্যে। সজাগ-এর বীজ  কৃষকের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে । সজাগ-এর বীজ ব্যবহার করে কৃষক প্রতি বিঘায় ২-৩ মণ ধান বেশি ফলন পায়। কৃষকদের মতে সজাগ-এর বীজ ধান শত ভাগ গজায়, অন্য জাতের মিশ্রণ নেই এবং ফলন বেশি হয়। সজাগ কৃষকদেরকে মান সম্পন্ন উচ্চফলনশীল জাতের ফসলের বীজ সরবরাহের লক্ষ্যে চলতি বোরো মৌসুমে ১০০ টন ব্রিধান-২৯ জাতের বীজ এবং ২টন বারি সরিষা বীজ উৎপাদন করেছে । সজাগ শুধুমাত্র নিজেরাই বীজ উৎপাদন করে সদস্যদের সরবরাহ করে না, সদস্যরা যাতে মান সম্পন্ন বীজধান উৎপাদন করতে পারে এ লক্ষ্যে চলতি বছরে ২০০ জন কৃষক সদস্যকে বীজ ধান উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। প্রশিক্ষিত ১৫০ জন সদস্য  চলতি বোরো মৌসুমে ১০০ টন ব্রিধান ২৯ জাতের বীজ ধান উৎপাদন করেছে।

গুটি ইউরিয়া কর্মসূচিঃ ইউরিয়া সার সাশ্রয়ের লক্ষ্যে পিকেএসএফ-এর আর্থিক সহায়তায় বোরো মৌসুমে ‘সজাগ’ তার কর্মএলাকার কৃষকদের নিয়ে গুটি ইউরিয়া কার্যক্রম শুরু করে ২০০৮ সাল থেকে। সজাগ-এর সহায়তায় এ বছর গুটি ইউরিয়া উৎপাদিত হয়েছে ২৫০ মেট্রিক টন এবং ৯২০০ জন কৃষক ১১,৫০০ বিঘা জমিতে বোরো  ধান চাষে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করেছেন। গুটি ইউরিয়া সম্পর্কে উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে এ বছর ৪,৫০০ কৃষককে গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের অরিয়েন্টেশন দেওয়া হয়েছে। গুটি ইউরিয়া প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণের জন্য এ বছর গুটি ইউরিয়া বিষয়ক ৩টি কর্মশালা ও ২০টি গুটি ইউরিয়া প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। পিকেএসএফএর লিফট কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এ-প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ : খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে কৃষিই মূল। আর কৃষির জন্য প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নানা সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে দেশের শস্য উৎপাদন বিগত ২৫ বছরে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি অর্জন সম্ভব হয়েছে। শুধু কৃষি যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতি বছর মোট খাদ্যশস্য উৎপাদনের ৭-১০ ভাগ অপচয় হয়। বাস্তবতা এবং সময়ের প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের কৃষিতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি রাইচ ট্রান্সপ্লান্টার, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, হ্যান্ড রিপার, কম্বাইন হারভেস্টর, ভূট্টা বপণ, আন্তপরিচর্য়া ও মাড়াই যন্ত্র ইত্যাদি এখন কৃষকদের মাঝে অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মত কৃষি কর্মকা- পরিচালনা করার জন্য কৃষকদেরকে কৃষি যন্ত্রপাতিসমূহ সরবরাহের লক্ষ্যে সজাগ কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

কম্বাইন্ড হারভেস্টার : কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে একই সময়ে প্রতি ঘন্টায় ১ একর জমির ধান কাটাসহ মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দী করা যায়। চলতি বোরো মৌসুমে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ৫টি স্পটে ধান কাটার প্রদর্শনসহ ৮০ জন কৃষকের ৪০.০০ একর জমির ধান কর্তন করে। শত শত নারী-পুরুষ, কৃষক-কৃষাণী মেশিনে ধান কাটার দৃশ্য উপভোগ করেন এবং আনন্দে উদ্বেলিত হন। আগামী বোরো মৌসুমে এ প্রযুক্তিটি গ্রহণে অধীর আগ্রহ প্রকাশ করেন।